পর্যটন ডেস্কঃ একটি দেশকে চিনতে হলে শুধু তার নদী, পাহাড়, সমুদ্র কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখলেই হয় না; চিনতে হয় সেই দেশের মানুষকেও। একজন বিদেশি পর্যটক যখন কোনো দেশে যান, তখন সেখানকার মানুষের আচরণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিপদে সহযোগিতা পাওয়ার অভিজ্ঞতা সবকিছু মিলিয়েই তার কাছে দেশটির পরিচয় তৈরি হয়। তাই একজন পর্যটকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও কখনো কখনো একটি দেশের ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে যায়। সম্প্রতি বন্ধু শিমুলের কাছ থেকে এমনই একটি দুঃখজনক ঘটনা শুনলাম। জার্মানি থেকে বাংলাদেশে আসা মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ কয়েক দিন তার বাসায় ছিলেন। পরে নাটোরে যাওয়ার পর তার থাকার জায়গা থেকে ল্যাপটপ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। পরে পুলিশ তার ল্যাপটপ উদ্ধার করেছে বলে জানতে পেরেছি। ঘটনাটি শুনে খারাপ লাগার পাশাপাশি একটি প্রশ্নও মনে এসেছে—আমরা কি সত্যিই বাংলাদেশকে বিদেশি পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারছি? বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান, পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার যথেষ্ট উপাদান। কিন্তু পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেই পর্যটনশিল্প বিকশিত হয় না। এজন্য প্রয়োজন নিরাপত্তা, সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং এমন একটি পরিবেশ, যেখানে একজন বিদেশি নিজেকে অসহায় মনে করবেন না। বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের আলোচনায় এই বিষয়গুলো যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা, বাস্তবে ততটা পায় না। আমরা পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য তুলে ধরতে আগ্রহী, কিন্তু পর্যটকের নিরাপত্তা, হয়রানি প্রতিরোধ, অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা করি। অথচ একজন পর্যটকের কাছে এসব বিষয় কোনোভাবেই গৌণ নয়। এ ঘটনার প্রসঙ্গে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পুলিশ বিদেশি পর্যটকদের সহযোগিতা করে না—এমন সাধারণীকরণ আমি সমর্থন করি না। আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, বাংলাদেশের পুলিশ বিদেশি পর্যটকদের সহায়তা করার চেষ্টা করে। নাটোরের ঘটনাতেও ল্যাপটপ উদ্ধারের তথ্য পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে ইতিবাচক দিক তুলে ধরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা সব সময় পাওয়া যায় না। ইতালির মিলানে আমার জিনিসপত্র হারানোর পর প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা পুলিশ স্টেশনে বসে থেকেও উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা পাইনি। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে আমার মুঠোফোন চুরি হয়েছিল। কে চুরি করেছে, সে সম্পর্কেও আমার ধারণা ছিল; তারপরও কার্যকর সহায়তা পাইনি। এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমি কখনো বলব না যে ইতালি কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ বিদেশিদের সাহায্য করে না। একই যুক্তিতে বাংলাদেশের কোনো ঘটনায় পর্যটক প্রত্যাশিত সহায়তা না পেলেও পুরো পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ কত দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে, চুরি যাওয়া সম্পদ উদ্ধারে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং ভুক্তভোগীকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা দিচ্ছে কি না। কোনো ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। আবার যেখানে ভালো কাজ হচ্ছে, সেখানেও তা স্বীকার করতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললে কেউ কেউ ভাবতে পারেন, তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন? আমার বক্তব্য হলো, বিদেশি বলে কাউকে বিশেষ আইনি সুবিধা দিতে হবে—এমন নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের মতো একজন বিদেশি পর্যটকেরও নিরাপদে চলাফেরা করা, নিজের সম্পদ রক্ষা করা এবং অপরাধের শিকার হলে ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে কিছু বাড়তি বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হয়। তিনি স্থানীয় ভাষা জানেন না, এলাকার পথঘাট চেনেন না, স্থানীয় আইন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তার ধারণা সীমিত থাকতে পারে। বিপদে পড়লে কোথায় যাবেন, কার কাছে অভিযোগ করবেন কিংবা কীভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন—এসব বুঝতে তার সমস্যা হতে পারে। এই জায়গাগুলোতে পর্যটন পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন, হোটেল কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সহজে যোগাযোগ করা যায় এমন সহায়তাব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় তথ্যের সহজলভ্যতা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি একজন পর্যটকের নিরাপত্তাবোধ বাড়াতে পারে। নাটোরে জার্মান তরুণটির ল্যাপটপ উদ্ধার হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক খবর। কিন্তু তার অন্য জিনিসপত্র, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, সেটিও জানা প্রয়োজন। একই সঙ্গে চুরির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর বার্তা দেবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, একজন পর্যটক যেন অপরিচিত পরিবেশে প্রতারণা, চুরি বা হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত না থাকেন। পরিবহন, আবাসন, খাবার, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন এবং জরুরি সহায়তা—প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। এখানে স্থানীয় জনগণেরও দায়িত্ব রয়েছে। পর্যটকের অসহায়ত্বকে সুযোগ হিসেবে দেখা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, প্রতারণা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পদ আত্মসাতের মতো অপরাধ শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না; দেশের সুনামও ক্ষুণ্ন করে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। নাটোরে জার্মান তরুণটির সঙ্গে ঘটে যাওয়া চুরির ঘটনা দিয়ে বাংলাদেশের সব মানুষকে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি ঘটনাটিকে ছোট করে দেখাও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। একটি দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হলে ভুলকে ভুল বলতে হবে, অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং একই সঙ্গে ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে সামনে আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একজন পর্যটকের অভিজ্ঞতা দ্রুত আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তিনি বাংলাদেশ থেকে ফিরে গিয়ে যদি নিরাপত্তাহীনতা কিংবা অসহযোগিতার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন, তা অন্যদের ভ্রমণের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে। আবার তিনি যদি মানুষের আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও নিরাপত্তার ইতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফেরেন, সেটিও বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান প্রচার হয়ে উঠতে পারে। তাই বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তাকে কেবল পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হবে, প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় থাকতে হবে এবং সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। রাজশাহী, নাটোর ও আশপাশের এলাকার ভ্রমণপ্রেমী বন্ধু এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আমার আহ্বান—জার্মান তরুণটির হারানো কাগজপত্র ও অন্যান্য জিনিসপত্র উদ্ধারে কারও কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। পুলিশকে তদন্তে সহযোগিতা করুন। তবে যাচাই ছাড়া কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আমি চাই, আরও বেশি বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসুন। তারা আমাদের প্রকৃতি দেখুন, ইতিহাস জানুন, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হোন এবং এ দেশের মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করুন। কিন্তু এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু পর্যটনকেন্দ্রের প্রচার বাড়ালেই হবে না; পর্যটকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে। শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা কি বিদেশি পর্যটকদের শুধু বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানাব, নাকি তাদের নিরাপদে ভ্রমণ করার নিশ্চয়তাও দিতে পারব? আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশকে সত্যিকারের পর্যটকবান্ধব দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, কাজে দিতে হবে। কারণ একটি দেশের সৌন্দর্য তার প্রকৃতিতে, আর সেই দেশের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয় তার আচরণ, নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.pro
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল